বাংলাদেশের আসল সমস্যাটা
কোথায়? কেউ বলে দুর্নীতি প্রবনতা, কেউ বলে প্রশাসনিক ব্যবস্থা, আবার অনেকেই বলে
থাকে পুরো সমস্যা কাঠামোর।
সমস্যা প্রত্যেকটি, এটা সঠিক, কিন্তু প্রধান কি? এসবের মূলে আসলে সমস্যাটা কোথায়,
যেটাকে স্পষ্ট পরখ করা যায় না, বা সমস্যা বলে মনেই হয় না?
বাংলাদেশ একটি তৃতীয়
বিশ্বের দেশ। উন্নত দেশগুলোর সাথে ‘উন্নয়নশীল’
তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর পার্থক্য এখানেই যে, উন্নত বিশ্বের সকল দেশের অর্থনৈতিক
ভিত্তি আছে আর ‘উন্নয়নশীল’ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে নেই, আছে ‘পরনির্ভরশীল’ অর্থনীতি। ‘বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটা অবশ্যই প্রাক-আমলে স্থাপন করা উপনিবেশ শাসন-আমলের
এক অনিবার্য ফল।’ নিজস্ব জাতীয়
বাজারে দেশীয় পণ্যের বাজার গঠন হয় না এসব তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে, বাজার দখল করে রাখে বাইরের দেশগুলো। কম মূল্যে শ্রম বিক্রয় করবার সামর্থ থাকায় তৃতীয় বিশ্ব হতে উৎপাদিত পণ্য বাইরে
যে কোন বাজারে কম মূল্যে বিক্রয় হয়ে থাকে। অন্য
দিকে বিদেশী পণ্য দখল করে রাখে জাতীয় বাজার। অনেকের
ধারণা থেকে থাকতে পারে কম দামে পণ্য উৎপাদন করে বিদেশী বাজার দখল করা সম্ভব; ভুল,
মুক্তবাজার অর্থনীতি কথায় লেখা থাকলেও নিজ বাজারের স্বার্থহানি হবে এমন কোন কাজ
কখনও কোন দেশ করবে না। বিস্তারিত ব্যখ্যা হবে
নিম্নে। আর বিশ্বায়নের বর্তমান যুগে কম
মূল্যে শ্রম খাটিয়ে মুনাফা বাড়াবার জন্য উন্নত বিশ্বকে নির্ভর করতে হয় এই সব নিম্ন
স্তরের দেশগুলোর ওপর, তাই বলা যেতে পারে উন্নত বিশ্বের স্বার্থ কেবল তৃতীয় বিশ্বকে
টিকিয়ে রাখবার, উন্নয়নের জন্য নয়।
পূর্বে দেখা গেছে বাজারের
পরিধি বৃদ্ধি করার লক্ষ নিয়ে অনেক রকম কৌশল অবলম্বন করা
হয়েছে। এক রাজার বিরুদ্ধে আরেক রাজার
যুদ্ধ, বৃটিশ উপনিবেশ স্থাপন, বিশ্বযুদ্ধ সহ অতীতের
সকল যুদ্ধ এবং রষ্ট্রীয় দ্বন্দ্ব, এবং বর্তমানের সকল কৌশলগত বা সরাসরি যুদ্ধ, সকল কিছুর মূলেই প্রমানিত আছে এক
পাক্ষিক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি।
বাংলাদেশের প্রসঙ্গে বলা
যায়, অর্থনীতি যেহেতু বাইরের বাজারের উপর নির্ভরশীল, সেহেতু বাইরে পণ্য [শ্রম] বিক্রি
করা না গেলে অর্থনীতি ধ্বসে পড়বে। আর
বাইরের বাজার প্রতিষ্ঠা হয় বিভিন্ন চুক্তির মাধ্যমে, যা সরকার পক্ষ থেকে করা হয়। অপর দিকে ব্যবসায়ীদের ধর্মই হল টাকা বানানো, বাইরে যাতে
তাদের পণ্যের বাজার টিকে থাকে, সেজন্য নানা ভাবে পায়তারা করতে থাকে সবসময়। তাই সরকারের সাথে একান্ত ঘনিষ্ঠতা রাখবার চেষ্টা করে তারা-
অর্থ সাহায্য দিয়েই হোক, আর যেভাবেই হোক না কেন। আর এরকম কারণ থেকেই আমরা দেখি সরকারী চাকুরীপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা খুব অল্প
সময়ের মধ্যেই এরকম হাজারও পৃষ্ঠপোষকতায় আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়ে যায়। আর আমরা এটাকেই বলি দুর্নীতি।
একটা উদাহরণ ধরা যাকঃ বিদ্যুত খাতে দুর্নীতি। সরকার অহেতুক একটা রাস্তায়
সোলার প্যনেল বসিয়ে বাতি জ্বালাবে। ব্যবসায়ীরা
প্রথমে সরকারকে টাকার প্রস্তাব করবে পার্লামেন্টে এই বিল পাস করাবার জন্য। তারপর সব ব্যবসায়ীরা নিজে কাজ পাবার জন্য করে সরকারকে অর্থ
দেবার প্রলোভন দেবে। যে এই প্রতিযোগীতায়
টাকার অংক বেশী দেবে সেই কাজ পাবে। আর
ব্যবসায়ী বাইরে থেকে আমদানী করে সোলার প্যনেল বসিয়ে সেখান থেকে বিশাল লাভাংশ তুলে নেবে।
আবার এমনও হতে পারে ঘনিষ্ঠতার খাতিরে কাজ পেয়ে সে টেন্ডারটি বিক্রি করে দিল; বিনা বিনিয়োগে
[investment] বিশাল অংকের টাকা উপার্যন করে ফেলল- আর এভাবেই
মানুষ ভিখারি থেকে কোটিপতি তে পরিণত হয়। ব্যবসায়ী যাই করুক না কেন, সে মুনাফার জোয়ারে ভেসে যায় আর দেশের টাকা অঘোরে
বাইরে চলে যায়।
অন্যদিকে এই সব
ব্যবসায়ীরা দেশীয় পণ্যের ব্যবসায়ীদের বাজার নষ্ট করে একেবারে ব্যাঙ্গের ছাতার মত
দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরকার যখন বাইরের
বাজারের সঙ্গে চুক্তি করে, তখন আবার এমন ব্যবস্থা করে রাখে যে আমদানীক্রৃত সোলার
প্যনেলের দাম দেশীয় সোলার প্যনেল’র থেকে কম হয়ে থাকে- বিদেশী দেশটি নিশ্চয় নিজের লোকসান
দিয়ে চুক্তি করবে না। ফলে যা হয়ে থাকে, দেশীয়
সোলার কারখানা মার খেয়ে যায়। দেশীয়
কারখানা বন্ধ হয়ে যায়, ব্যবসায়ীরা ঝুঁকে পড়ে আমদানী-রপ্তানী ব্যবসায়, সরকারের
সঙ্গে সকল মহলের আর্থিক ঘনিষ্ঠতা বেড়েই চলে, একই সাথে বাড়ে দুর্নীতি। এটাকেই আমরা বলি দূর্বল প্রশাসনিক ব্যবস্থা।
[এই ঘনিষ্ঠতা
সৃষ্টিকারীরা অর্থাৎ তদবিরকারীরা চালু করে এমনই এক সংস্কৃতি, যেখানে বিনা পরিশ্রমে
বিপুল উপার্যন করা সম্ভব- তাই এখন প্রায় সবখানেই এই সংস্কৃতির প্রচলন আমরা
প্রত্যক্ষ করি। টাকা যেখানে মানুষকে দাস করে রেখেছে, সেখানে বাড়তি উপার্যনে ক্ষতি
কিসের ? ]
কেন দুর্নিতী আমাদের
অর্থনীতির প্রধান সমস্যা নয়, সেটা একটু আলোচনা করা উচিৎ। বাংলাদেশের প্রধান আয়ের
উৎস হচ্ছে উৎপাদনশীল কৃষি খাত, শিল্প খাত এবং রেমিটেন্স থেকে। আর অর্থনীতি থেকে ব্যায়
হয়ে যায় আমদানীতে [আমাদের প্রায় সকল ব্যবহারিক পণ্য বিদেশী] এবং অন্যান্য নানা
কারণে। দুর্নিতী থেকে অবৈধ টাকার একটা সুযোগ থেকেই যায় দেশে পুনরায় খাটাবার,
কিন্তু যে টাকা আমদানি তে ব্যায় হয়, সেই টাকাগুলো অর্থনীতি থেকে হাওয়া হয়ে যায়
পুরোপুরি ভাবে। আর বাইরে কোথাও যে দুর্নিতী হয় না, সেটাও নয়।
সংকলন করে যা বোঝা যেতে
পারে, দুর্নীতি, প্রশাসন ইত্যাদি এগুলো কোনটাই মূল সমস্যা নয় বাংলাদেশের জন্য। মূল সমস্যা হচ্ছে নিজস্ব অর্থনৈতিক ভিত্তির অভাব, যেটা
অনিবার্যভাবে বাকি সব ধরণের সমস্যার কারণ। এই
সমস্যা দূর করতে হলে প্রকৃত জনগনের প্রশাসন দরকার, আন্তর্যাতিক হস্তক্ষেপ দূর করা
দরকার আর দরকার পুরাতন সমাজ কাঠামোর পরিবর্তন; অন্যথায় অন্যান্য সকল সংস্কার
অনিবার্যভাবে বিপথে যাবে।
সবিশেষে আরো একটি
প্রেক্ষাপট তুলে ধরা উচিৎ। বাংলাদেশের
আয় এবং ব্যায় যদি ধরে নেওয়া যায় সমান সমান [যেটা বাস্তবে মোটেই সমান নয়] তাহলে
অর্থনীতিতে মোট অর্থের পরিমান অপরিবর্তনশীল থাকে। আবার একই দিক হতে দেশে মুষ্ঠিমেয়
কিছু মানুষের কাছে অর্থ জমা হচ্ছে, তারা বড়লোক হয়ে উঠছে। এই যদি হয়, তাহলে ব্যপার এটাই দাঁড়ায় যে দেশের বাকি মানুষের কাছ থেকে অর্থ
কমছে আর এই মুষ্ঠিমেয় লোকেদের কাছে গিয়ে জমা হচ্ছে। জনগণ হচ্ছে গরীব, আর এই তদবিরকারীরা হচ্ছে বড়লোক।
Bangladesh Apparel News
Bangladesh Apparel News